IELTS পরিচিতি

আমাদের দেশে শিক্ষা জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার জন্যে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি, এমন নজির খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্টকর। অনেকেই মনে করেন, এই প্রক্রিয়া হয়তো অনেক ব্যয়বহুল, আবার অনেকে মনে করেন, না জানি এই ভর্তি প্রক্রিয়া কতটা কঠিন। তাই উপযুক্ত তথ্যের অভাবে অনেকের এই উচ্চস্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।

অনেকের মনেই এই ধারণা বদ্ধমূল যে, ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য হয়তো আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া লাগে, যেটি একদমই ভুল। বরং আমাদের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে যেমন কলেজগুলোতে ভর্তি করা হয়, ঠিক তেমনই কিছু সাধারণ মানদণ্ড সম্বলিত পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পড়ার সুযোগ (কখনো কখনো বৃত্তি) দিয়ে থাকে।

এখন এই প্রশ্নটি মনে আসা খুবই স্বাভাবিক যে, নতুন করে পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন কি? আমাদের দেশে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তি করলেই তো হতো। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে, সব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান একরকম নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যে শিক্ষার্থীকে ভালো বলে আখ্যায়িত করছে, সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তাকে তেমনটা না-ও বলতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে এমন কিছু পরীক্ষা রয়েছে যার মান নিয়ে কোনো দেশই সন্দিহান নয়। এমনই কিছু পরীক্ষা হলো জিআরই/জিম্যাট, আইইএলটিএস, স্যাট এবং টোফেল।

সব পরীক্ষা নিয়েই ধাপে ধাপে আলোচনা করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আইইএলটিএস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

আইইএলটিএস

আইইএলটিএস এর পূর্ণ রুপ ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম (International English Language Testing System)। এটি মূলত ইংরেজি ভাষাপ্রধান দেশগুলোতে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো কারো ব্যবহারিক ইংরেজির উপর দক্ষতা পরিমাপ করা। উদাহরণস্বরুপ, একজন অবাঙালি ব্যক্তি ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলতে পারলেও তাকে কিন্তু একজন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাথে স্বাভাবিক কথোপকথন চালিয়ে যেতে বেশ বেগ পেতে হবে। তাকে আমাদের মতো বাংলা বলতে হলে উচ্চারণ, লেখনী, শ্রবণ সব দিক থেকে সমান পারদর্শী হতে হবে।

ঠিক তেমনই আমরা যারা নন-ন্যাটিভ ইংরেজি বলি, ন্যাটিভ ইংরেজি ব্যবহারকারীদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাদের বেশ সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এসব দেশগুলোতে পড়তে গিয়ে যেন এরুপ কোনো সমস্যাতে না পড়তে হয়, তা নিশ্চিত করাই এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য।

আইইএলটিএস পরীক্ষা মূলত ৪টি পরীক্ষার সমষ্টি। আইইএলটিএস এর স্কোরেও এই ৪টি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নাম্বারের গড় করে হিসাব করা হয়। এই ৪টি পরীক্ষা হলো রিডিং, রাইটিং, লিসেনিং এবং স্পিকিং। পরীক্ষাগুলোতে ৯ এর মাঝে নাম্বার দেওয়া হয়। আলাদা আলাদাভাবে পরীক্ষায় প্রাপ্ত নাম্বারসমূহকে যোগ করে ৪ দ্বারা ভাগ করে সর্বশেষ আইইএলটিএস স্কোর নির্ধারণ করা হয় ।

এখন মনে হতে পারে, ঠিক কত নাম্বার পেলে সেটাকে বেশ ভালো একটি আইইএলটিএস স্কোর বলা যাবে। এর জন্য যে হিসাবটি রয়েছে তা অনেকটা এরকম-

  • ৯ এর মাঝে ৫ পাওয়াকে ধরা হয় একজন চালিয়ে নেওয়ার মতো ইংরেজি পারে।
  • ৬ পাওয়াকে ধরা হয় সে মোটামুটি দক্ষ ইংরেজিতে।
  • ৭ পাওয়াকে ধরা হয় সে ইংরেজিতে দক্ষ। তাই আইইএলটিএস স্কোর ৭-কে বেশ ভালো মানের স্কোর বলা যেতে পারে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিতে এই স্কোরের চাহিদা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে, এই স্কোর থাকলে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা পূরণ হবে বলে আশা করা যায়।

আইইএলটিএস পরীক্ষাটি ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং আইডিপি (ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই পরীক্ষায় রেজিস্ট্রেশনের জন্য পরীক্ষার্থীর একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক। সেই সাথে প্রয়োজন পাসপোর্ট সাইজের ছবি, পূরণকৃত ফর্ম এবং সবশেষে রেজিস্ট্রেশন ফি। আইইএলটিএস এর রেজিস্ট্রেশন ফি সময়ের সাথে সাথে ওঠা নামা করে। তবে মোটামুটি এই ফি ১৪,০০০-১৭,০০০ টাকার মধ্যে হয়।

বাংলাদেশে সর্বমোট ৫টি বিভাগীয় শহরে আইইএলটিএস এর জন্য নিবন্ধন এবং পরীক্ষা দেওয়া যায়। ৫টি শহরের মধ্যে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামে ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং আইডিপি উভয়ের অফিস রয়েছে এবং রাজশাহীতে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও সিলেটে আইডিপির অফিস রয়েছে। এই সমস্ত অফিসের যেকোনো একটিতে গিয়ে নিবন্ধন এবং পরীক্ষা দেওয়া যায়।
রিডিং ও রাইটিং ১ ঘণ্টা করে, স্পিকিং ১৫-২০ মিনিট, লিসেনিং ৪০ মিনিট এবং ভেরিফিকেশন (ভেরিফিকেশন হলো পরীক্ষার্থীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যান, ডাটা ফিল আপ ইত্যাদি কাজ) প্রায় ১ ঘণ্টা- সব মিলিয়ে প্রায় ৪ ঘণ্টার পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার মাঝে কোনো বিরতি থাকে না। পরীক্ষায় প্রাপ্ত নাম্বার সাধারণত পরীক্ষার দিন হতে ১৪তম দিনে প্রকাশ করা হয়। ফলাফল অনলাইনে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে এবং তাদের অফিসের নোটিশ বোর্ডে- উভয় জায়গা থেকেই সংগ্রহ করা যায়। একটি আইইএলটিএস পরীক্ষার স্কোর সাধারণত ২ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

সবথেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে, আইইএলটিএস পরীক্ষা দেওয়ার কোনো সময়সীমা নেই। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি তার জীবনে যতবার ইচ্ছা ততবার এই পরীক্ষা দিতে পারবে । তবে প্রতিবার দেওয়ার জন্য তার একই পরিমাণ নিবন্ধন ফির প্রয়োজন হবে। একাধিকবার দেওয়ার ক্ষেত্রে যে তাকে সর্বশেষ প্রাপ্ত স্কোরই ব্যবহার করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং সময়সীমা থাকা সাপেক্ষে যেকোনো স্কোর ব্যবহার করা যাবে।

অভিজ্ঞদের মতে, আইইএলটিএস-এ ভালো একটি স্কোর করার জন্য ২-৩ মাসের একনিষ্ঠ প্রস্তুতিই যথেষ্ট। তাই দেরি না করে আজই নিবন্ধন করে ফেলুন এবং প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দিন আপনার স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ পেরোনোর জন্য।

Comments