সাংবাদিকতার ছাত্ররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যেভাবে যাবেন

তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি আর আগ্রহী ছাত্রদের জন্য সাংবাদিকতা হতে পারে পড়ালেখার জন্য একটি আদর্শ বিষয়। আর এতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও রয়েছে অবারিত। সংবাদ কাটাছেড়া করে দ্রুত তার নিখুঁত বিশ্লেষণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর দিকেও ঈগলের মতো নজর রাখাও এই মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির কাজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার সুযোগ কম নয়। পেনি প্রেস ও হলুদ সাংবাদিকতার জন্মভূমির এই দেশে সাংবাদিকতা করতে হলে আন্তর্জাতিক ছাত্রদেরকে হতে হবে পরিশ্রমী, থাকতে হবে চাপের মধ্যে কাজ করার দক্ষতা, সাথে অনুসন্ধানী মন আর অসাধারণ লেখার হাত তো আবশ্যক।

সাংবাদিকতার বিশাল ক্ষেত্রে এর ধরনও রয়েছে বিভিন্ন রকম। বিদেশি ছাত্ররা যেদিকে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তার জন্য আলাদা বিশেষ কোর্স সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রামে রয়েছে কি না তা দেখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন: ব্রডকাস্ট সাংবাদিকতার উপর বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির জন্য স্বভাবতই রেডিও অথবা টেলিভিশনে ক্যারিয়ার গড়া সহজ হবে, অন্যদিকে প্রিন্ট সাংবাদিকতায় পড়া ব্যক্তির জায়গা হবে সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে। অনলাইন সংবাদপত্র, ব্লগ এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য অনলাইন সাংবাদিকতার উপর বিশেষ কোর্স থাকা জরুরি, আর ফটোসাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোর্স তো রয়েছেই।

জার্নালিজম পড়তে আগ্রহী? সুযোগও কিন্তু কম নয়; Image Source: Queens College Urban Studies

কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাই করবেন?

যুক্তরাষ্টের প্রায় সর্বত্রই সাংবাদিকতার জন্য ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি প্রোগ্রাম রয়েছে। তবুও ক্যারিয়ার গড়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথায় তা দেখে নেওয়াটা জরুরি। কারণ সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত সেই অঞ্চলের বিশেষত্বের উপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে। কোনো ছাত্র যদি কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, যেমন: কেউ যদি প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহী হয়, তবে তার লক্ষ্য হবে সিলিকন ভ্যালির পাশে থাকা স্যান ফ্রান্সিস্কোতে। অন্যদিকে ঠিক একইভাবে ব্যবসা নিয়ে আগ্রহী ছাত্রদের লক্ষ্য হবে নিউ ইয়র্ক এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে তা হবে ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে।

১৯০৮ সালে চালু হওয়া বিশ্বের প্রথম সাংবাদিকতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থ ক্যারোলাইনার ইউনিভার্সিটি অফ মিসৌরিতে ব্যবসা, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য কিংবা আইনের জন্য আলাদা যুগ্ম-কোর্স রয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতার ছাত্ররা এসব ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা করতে পারবেন। অন্যদিকে নিউ ইয়র্কের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিগুলোর কেন্দ্রে অবস্থান করা এবং একইসাথে সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাদের গ্র্যাজুয়েট তৈরির জন্য বিখ্যাত হলেও তাদের ব্যাচেলর ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা নেই।

সবচেয়ে পুরনো জে-স্কুল ইউনিভার্সিটি অফ মিসৌরি; Image Source: Missouri School of Journalism

আবেদনের জন্য ছাত্রদের যা যা প্রয়োজন

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া বেশ জটিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছয় মাস এমনকি এক বছরও লেগে যেতে পারে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা জরুরি। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হলেও নিচের ডকুমেন্টসগুলো প্রায় সবক্ষেত্রেই কাজে লাগে।

ট্রান্সক্রিপ্টস: মাধ্যমিক শিক্ষার আসল ট্রান্সক্রিপ্ট

টেস্ট স্কোর: এসিটি, এসএটি, টোয়েফল বা আইইএলটিএস এর স্কোর সরাসরি টেস্ট সেন্টার থেকে পাঠাতে হবে। অন্য কোনো জায়গা থেকে পাঠানো হলে তা অফিশিয়াল হিসেবে গণ্য হবে না।

এসে (Essays)/ রচনা: ছাত্রদের যোগ্যতা পরীক্ষা করার জন্য এক থেকে তিনটি এসে লিখে পাঠাতে হয়। প্রতিষ্ঠানভেদে এসের সংখ্যা ও বিষয় নির্ভর করে।

রিকমেন্ডেশন লেটার: শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গবেষণার সুপারভাইজরের কাছ থেকে কমপক্ষে ১ থেকে সর্বোচ্চ ২টি রিকমেন্ডেশন লেটার চেয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

খরচ বহনের প্রমাণপত্র: কমপক্ষে এক বছরের থাকা ও টিউশন ফি পরিশোধের সক্ষমতার সনদপত্রও আবেদনের জন্য প্রয়োজন পড়বে।

টেস্ট স্কোর কত প্রয়োজন

বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের জন্য সাধারণত এসিটি অথবা এসএটি-র ফলাফল দেখা হয়। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এগুলোর পাশাপাশি মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলও দেখা হয়। যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়, তাদের অবশ্যই এসএটি অথবা আইইএলটিএস থাকতে হবে।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভাষার উপর দক্ষতা অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সাধারণত অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় সাংবাদিকতার জন্য টোয়েফল বা আইইএলটিএস স্কোর বেশি চেয়ে থাকে। সাংবাদিকতার জন্য ন্যূনতম পেপার-বেজড টোয়েফলের ক্ষেত্রে ৫৫০-৬৫০, ইন্টারনেট-বেজড টোয়েফলের ক্ষেত্রে ৭৯-১০০ এবং আইইএলটিএস-এর ক্ষেত্রে ৬-৭ স্কোর থাকা প্রয়োজন।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্কোর কম থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা অথবা কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমেও ছাত্রদেরকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়।

সুযোগ পেতে হলে আইইএলটিএস বা টোয়েফলের পাশাপাশি এসএটি বা এসিটি-তেও ভালো করা প্রয়োজন; Image Source: Vox

জার্নালিজম ডিগ্রি প্রোগ্রাম

আন্ডারগ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সাংবাদিকতায় পড়ার জন্য আলাদাভাবে অনুমতি নিতে হয়। এসএটি/এসিটি স্কোর অসাধারণ হলে সাথে সাথেই সাংবাদিকতায় নিয়ে নেওয়া হয়, অনেক সময় মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলও দেখা হয়। অন্যদিকে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতার মূল কোর্সের আগে ১ বছরের সাংবাদিকতার বেসিক-কোর্স করিয়ে নেওয়া হয়। এর সুবিধাও রয়েছে: কোনো ছাত্র আসলেই সাংবাদিকতায় আগ্রহী কিংবা তার জন্য সাংবাদিকতা আদৌ সঠিক সিদ্ধান্ত হবে কি না তা বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় না করেই বুঝে ফেলতে পারবে।

যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেই বিদেশি ছাত্রদেরকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ: ভিন্ন দেশে গিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক আলাদা সংস্কৃতির মুখোমুখি হয়ে ছাত্ররা অনেকেই থতমত খেয়ে যায়। শুধু সাধারণ পরিস্থিতি নয়, ক্লাসরুম কিংবা রেস্টুরেন্টেও আচার-ব্যবহারের পার্থক্য প্রকটভাবে চোখে পড়বে। ফলে হঠাৎ আমেরিকান সংস্কৃতির মাঝখানে গিয়ে অস্বস্তিকর লাগাটাই স্বাভাবিক।

এর সাথে অভ্যস্ত হতে হলে প্রথমেই আমেরিকার রীতিনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে নিতে হবে এবং ‘কালচার শক’-এর জন্য আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যাক, বাংলাদেশে ভিড়ের মধ্যে একে অপরের গায়ে স্পর্শ করা বা ধাক্কা খাওয়া হয়তো খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই স্পর্শীয় সংস্কৃতির প্রচলন নেই। তারা আগন্তুকের স্পর্শ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলে।

অন্যান্য দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো ছাত্রদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলাও ভালো একটি সমাধান হতে পারে। এতে নিজেকে ‘একমাত্র’ কালচার শকে ব্যক্তি হিসেবে মনে হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কও এশিয়ার দেশগুলোর মতো ততটা ফরমাল নয়। শিক্ষকদের সাথে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেটাও জেনে রাখা উচিৎ।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর টিউশন ফি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। একটি গড়পড়তা মানের প্রাইভেট কলেজে পড়তে হলেও বছরে প্রায় ৪৮ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার আগেই এই খরচ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে। বিদেশি ছাত্ররা পা রেখেই হঠাৎ করে যে অপ্রত্যাশিত জিনিসের মুখোমুখি হয় তা হচ্ছে স্বাস্থ্যবীমার খরচ। ফলে থাকা-খাওয়া আর পড়ালেখার খরচের পাশাপাশি যেন বিশাল মেডিকেল খরচও যোগ না হয়, তা সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে রাখা ভালো।

এগুলো এড়িয়ে চলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কোনো স্কলারশিপের ব্যবস্থা রাখা। প্রায় প্রতিটি বিষয়ের জন্যই একাধিক স্কলারশিপের ব্যবস্থা থাকে। বেশিরভাগ যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রদের জন্য প্রযোজ্য হলেও বিদেশি ছাত্রদের জন্যও এসব স্কলারশিপের দরজা খোলা থাকে। চোখ-কান খোলা রেখে নিয়মিত স্কলারশিপের খোঁজখবর রাখলে স্কলারশিপ পাওয়া কঠিন কিছু হবে না। এছাড়াও অর্থনৈতিক সাহায্যের জন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলেও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ছাত্রদেরকে লোন দেয়। তাদের সাথে কথা বলেও সাময়িক ব্যবস্থা করে নেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও পার্ট-টাইম চাকরি করেও নিজের ছোটখাট খরচ মেটানোর ব্যবস্থা করা যায়। ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়া-জিমনেশিয়াম কিংবা লাইব্রেরিতে চাকরি করার সুযোগ থাকে। এছাড়াও সাংবাদিকতা ছাত্রদের জন্য বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে কাজ করার সুযোগ তো রয়েছেই।

সামাজিক চ্যালেঞ্জ: বিদেশি ছাত্রদের ক্ষেত্রে আরেকটি যে প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, তা হচ্ছে সামাজিকতা। ভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে তাদের একটু সময় লাগে। ফলে প্রায়ই তাদেরকে একাকিত্বে ভুগতে দেখা যায়। এর মুখোমুখি হতে হলে প্রথমেই যতটা সম্ভব নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে হবে, বিশেষ করে স্থানীয় ছাত্রদের সাথে পরিচিত হতে পারলে আরও ভালো। পরিচিত হওয়ার জন্য বিভিন্ন ভলান্টিয়ারি কাজ কিংবা খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করাও একটি ভালো সমাধান।

নতুন পরিবেশে এসে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয় ছাত্রদেরকে; Image Source: Worker’s Liberty
ফিচার ইমেজ: USC Annenberg School for Communication and Journalism
Comments
Comments

Comments are closed.