তারুণ্যের শক্তিতেই বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখছেন জাপানী স্টার্টআপ বিশেষজ্ঞ রিয়ুজি উৎসুনোমিয়া

নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং স্টার্টআপ ইনকিউবেশনে অভিজ্ঞ জাপানী নাগরিক রিয়ুজি উৎসুনোমিয়া বর্তমানে আলফাড্রাইভ কোচি কোম্পানি লিমিটেড এবং লেফট হ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এর সিইও হিসেবে কর্মরত। কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার ডিগ্রি শেষ করে জাপানের অন্যতম বৃহৎ অ্যাডভার্টাইজিং ও মিডিয়া কোম্পানি রিক্রুট হোল্ডিংস কোম্পানি লিমিটেডে যোগদান করেন তিনি। সেখানে ৩ বছরের কর্মজীবনেই স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোর জন্য ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম চালু করেন তিনি। এই যাত্রাপথে এক হাজারের বেশি উদ্যোক্তা ও চার শতাধিক প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয় তার।

রিয়ুজি উৎসুনোমিয়া

ইতোমধ্যেই ষাটের অধিক দেশে ভ্রমণ করা এ মানুষটি বাংলাদেশে এসেছেন তিনবার। বাংলাদেশীদের আতিথেয়তা এবং কর্মোদ্দমী তরুণ সমাজ তাকে মুগ্ধ করেছে বারবার। তাই তিনি স্বপ্ন দেখেন এ দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে কিছু করার। সম্প্রতি ওয়াইএসআই বাংলা লিমিটেড এর পক্ষ থেকে ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টসে আয়োজিত জাপানে ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্পর্কিত একটি সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রিয়ুজি। সেমিনার শেষে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কেই। ওয়াইএসআই বাংলার পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাৎকার পুরোটাই তুলে ধরা হলো, যা তাদের ক্যারিয়ার সম্পর্কে আরো যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

১) আজকে জীবনে আপনি যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন, তার পেছনে কোন ঘটনাটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে আপনি মনে করেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে আমি এক বছরের জন্য বিশ্বভ্রমণে বের হয়েছিলাম, যেটা আমার জীবনের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।

আমি কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি। এটা জাপানের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে এখান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের চাকরি সুযোগের অভাব হয় না। আমার মেজর সাবজেক্ট কেমিস্ট্রি ছিলো বলে পেশাগত জীবনে একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারই হবার কথা ছিলো আমার।

কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষ করে আমি একটি গ্র্যাজুয়েট স্কুলে ভর্তি হয়ে যাই মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হিসেবে। কিন্তু, আমার আসলে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করা হয়ে ওঠেনি।

আমি তখন শিক্ষাজীবন থেকে এক বছরের বিরতি নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হবার পরিকল্পনা হাতে নিই। পার্ট-টাইম চাকরি করে আমি ঘোরাঘুরির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করি। এই বিশ্বভ্রমণের পেছনে শুরুতে আসলে আমার তেমন কোনো উদ্দেশ্যে ছিলো না। দুনিয়াটাকে দেখা এবং বোঝার উদ্দেশ্য নিয়েই আমি ঘর ছেড়েছিলাম।

ঘুরতে বের হয়ে অনেক কিছু আমি দেখলাম, অনেক মানুষের সাথেই আমার পরিচয় হলো। এই দুনিয়ার বিশালত্ব ও বৈচিত্রময়তা আমি বুঝতে শিখলাম, এর সৌন্দর্য আমাকে চুম্বকের মতো কাছে টেনে নিলো। তখনই মনে হলো, আমি আর কোনো গবেষণাগারে (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে) কাজ করছি না, বরঞ্চ আমি কাজ করছি এক বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে।

এরপরই আমি সিদ্ধান্ত নেই জাপানের একটি কোম্পানিতে কাজ করার ব্যাপারে যারা দেশটির অগণিত তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছে। এখন আমার নিজেরই দুটো কোম্পানি আছে জাপানে আর আমি সেখানে নিজের মতো করেই কাজ করি।

এসবের কোনোকিছুই হতো না যদি আমি তখন বিশ্বভ্রমণে বের না হতাম।

২) এবার নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফরে এলেন আপনি। কেমন লাগছে আমাদের দেশকে?

সত্যি বলতে, প্রথম যখন আমি বাংলাদেশে আসি, তখন আসলে বাংলাদেশ ও জাপানের মাঝে কিছু করার কথা আমি চিন্তাও করিনি। কিন্তু দেখতে দেখতে এই দেশে আমার তৃতীয়বার আসা হয়ে গেলো। যতবারই আমি এখানে এসেছি, ততই এ দেশ, দেশের মানুষ এবং তাদের আতিথেয়তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানে আমার বেশ কিছু নতুন বন্ধু হয়েছে, পরিচিত হয়েছি বেশ কিছু নতুন আইডিয়ার সাথেও।

ঢাকায় একটি সেমিনার শেষে অংশগ্রহণকারীদের সাথে ফটোসেশন

এখন বাংলাদেশ ও জাপানের মাঝে যৌথভাবে কিছু করাটা আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩) গত দুবারের ভ্রমণের চেয়ে এবারের বাংলাদেশে কী পার্থক্য দেখছেন?

প্রথমবার আমি বাংলাদেশে এসেছিলাম কেবলই একজন ট্যুরিস্ট হিসেবে, যা ছিলো আমার বিশ্বভ্রমণেরই অংশ। দ্বিতীয়বার একটি আইটি কোম্পানির জন্য ওয়েব ইঞ্জিনিয়ার খুঁজতে আসা হয়েছিল আমার এখানে। আর এবার এখানে আমি এসেছি একজন উদ্যোক্তা হিসেবে, যে এ দেশে ব্যবসার নানা ক্ষেত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে।

এবার আমার বাংলাদেশে আসার মূল উদ্দেশ্যে ছিলো বাংলাদেশে কোন কোন বিষয়ে ব্যবসার ভালো সুযোগ আছে তা খুঁজে দেখা। আমার এখনও অনেক কিছু বুঝতে হবে। কিন্তু এবার ওয়াইএসআই বাংলার লোকজনের মতো আরও বেশ কয়েকজনের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। এখন তাই আমার পরবর্তী লক্ষ্য হলো এমন কিছু কাজ হাতে নেয়া যার মাধ্যমে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব।

৪) এবারের বাংলাদেশের কোন বিষয়টি আপনার সবচেয়ে নজর কেড়েছে?

তারুণ্যের শক্তি। বাংলাদেশে রয়েছে অগণিত তরুণ, যারা নিজেদের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখার স্বপ্ন দেখে। পৃথিবীকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো এই তরুণদের এই শক্তি। তারাই পরিবর্তনের সূচনা করে দেয়। আশা করি সামনের দিনগুলোতে আমি বাংলাদেশী তরুণদের সাথে কাজ করতে পারবো বিভিন্ন বিষয়ে।

৫) জাপানকে বাংলাদেশ সবসময় বন্ধু-রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে। জাপানীদের চোখে বাংলাদেশীরা কেমন?

সত্যি বলতে, জাপানের মানুষজন বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব বেশি একটা জানে না, কারণ জাপানীরা এদেশে তেমন একটা ঘুরতে আসে না। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, বাংলাদেশ সম্পর্কে একবার অভিজ্ঞতা হলে তারাও এ দেশকে একটি বন্ধু-রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করবে। তাই আমি আশা করি, সামনের দিনগুলোতে জাপানের আরও অনেকেই বাংলাদেশে আসবে এবং এ দেশের নানাবিধ কাজকর্মের সাথে নিজেদের যুক্ত করবে।

৬) জাপান আর বাংলাদেশের মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কোথায় তৈরি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এর পেছনের কারণটাই বা কী বলে আপনার অভিমত?

যেহেতু আমি নতুন ব্যবসা গড়ে তোলা নিয়ে কাজ করি, তাই এ দেশ কতটা নতুন ব্যবসাবান্ধব আমি সেদিক নিয়েই কথা বলছি।

আমার মতে, একটি নতুন ওয়েবভিত্তিক সার্ভিস চালু করার ব্যাপারে জাপানী মার্কেটের তুলনায় বাংলাদেশ বেশ চমৎকার একটি জায়গা।

ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টসে আয়োজিত সেমিনার শেষে রিয়ুজি উৎসুনোমিয়ার হাতে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দিচ্ছেন ওয়াইএসআই বাংলা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুমন সাহা

এর পেছনে প্রথম কারণটিই হলো এ দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী। তরুণরা সবসময়ই নতুন কিছুর স্বাদ পেতে চায়। ফলে আপনি খুব সহজেই এখানে আপনার নতুন প্রোডাক্টের বিভিন্ন দিক যাচাই করে নিতে পারবেন। জাপানে তরুণদের তুলনায় বৃদ্ধদের সংখ্যা বেশি। আর তারা যেভাবে আছে সেভাবেই থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

দ্বিতীয়তে আসবে আইনগত বাধ্যবাধকতার বিষয়টি। আপনার জানা আছে কি না জানি না, জাপান কিন্তু আইনগত কড়াকড়ির দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। যখনই আপনি নতুন কিছু শুরু করতে যাবেন, আপনাকে নানা রকম লাইসেন্স ও নিবন্ধনের ভেতর দিয়ে যাওয়া লাগবে। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই বেশ অপচয় ঘটে। আমি যত দূর জানতে পেরেছি, বাংলাদেশে জাপানের মতো অতটা কড়াকড়ি নেই।

সবার শেষে আসবে বিভিন্ন সার্ভিস ডেভেলপের জন্য খরচের বিষয়টি। জাপানে চাকরির সুযোগের তুলনায় ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা কম। ফলে এক্ষেত্রে খরচের পরিমাণে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ওদিকে কোনো চাকরিতে ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের বেলায় বেতনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও জাপানের মাঝে বেশ বড় একটা পার্থক্য রয়েছে, যেটাও আশার বিষয়।

সব মিলিয়ে, আমার বিশ্বাস, নতুন কোনো ব্যবসা শুরুর ব্যাপারে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে চমৎকার একটি জায়গা।

৭) বাংলাদেশকে জাপানের মতো এক উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য এদেশের তরুণদের করণীয় কী?

বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশের এখন দরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষ করে তোলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে সেই দক্ষ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিভিন্ন সার্ভিস প্রদানের মাধ্যমে আয়ের রাস্তা তৈরি করা। বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছে অপার সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা তাদের দেশের জন্য এ কাজটি করতে প্রস্তুত। ফলে তরুণ জনগোষ্ঠীর মাঝে উদ্যোক্তা হবার সঠিক দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেয়াটা এখন সময়ের দাবি।

৮) বাংলাদেশকে নিয়ে আগামীতে কি আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে?

যেমনটা আমি আগেও বলেছি, বাংলাদেশকে এখন নজর দিতে হবে এমন সব কাজকারবারের দিকে যা তাদের আলাদা মূল্য তৈরি করবে বিশ্ববাজারে। আর এই অগ্রযাত্রায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারলে আমি নিজেও খুব খুশি হবো। উদাহরণস্বরুপ, বাংলাদেশের স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোর জন্য একটি ইনকিউবেশন/এক্সেলারেশন প্রোগ্রাম চালু করার ইচ্ছা আছে আমার। তাদের ব্যবসা গড়ে তুলতে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন জাপানী কোম্পানির সাথে তাদেরকে যুক্ত করতেও আমি সাহায্য করতে পারবো।

মোট কথা, বাংলাদেশ এবং জাপানের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নে অবদান রাখার মতো উপযুক্ত ক্ষেত্রের সন্ধানেই আছি আমি।

Comments

Comments are closed.